মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

ইউনিয়নের ইতিহাস

১৩নং মাদার্শা ইউনিয়নের ইতিহাস

“দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা

              দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু

শুধু দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া

                   ঘরের বাহিরে ছ’পা ফেলিয়া

     একটি ধানের শীষে একটি শিশির বিন্দু”

     মাদার্শা নামের উৎপত্তি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিমুখ আমাদের মন ও মানসিকতার নিরখে কবির উপরোক্ত উক্তি যথার্থ বলে প্রতিপন্ন হয়েছে। কেননা দেশের ঠাকুরকে ফেলে বিদেশের কুকুরকে পূজো করা আমাদের স্বভাবের অন্তর্গত। বিদেশের অনেক তথ্য আমাদের বুদ্ধিজীবীদের নখদর্পণে। অথচ স্বগ্রাম বিংবা এলাকার অনেক মূল্যবান ও প্রয়োজনীয় তথ্য আমাদের অজ্ঞাত থেকে যায়। একটু চেষ্টা করলেই নিজের এলাকার অজানা তথ্য উদ্ঘাটন করা তেমন কষ্ট সাধ্য ব্যাপার নয়। একটুঅনুসন্ধান করলেই দেখতে পাই কোন কোন ক্ষুদ্র এলাকার ইতিহাস বাংলাদেশ, ভারতবর্ষ উপমহাদেশ এমনকি বহিবিশ্বের ব্যাপক ইতিহাসের সংগে ওংপ্রোতভাবে জড়িত। বিন্দুর মাঝে সিন্ধু দর্শনের ন্যায় কোন কোন এলাকার ইতিবৃত্তের সহিত আন্তর্জাতিক ইতিহাসের রেশ খুজে পাওয়া যায়। তখন বিদেশকে আর বিদেশ মনে হয় না। সমগ্র বিশ্ব ও মানব সমাজকে স্বদেশ ও স্বজাতি বলেই মনে হয়। তাই আমাদের আত্মপ্রয়োজনেই ইতিহাসের চর্চা করা অপরিহার্য। ইতিহাস জাতির দর্পণস্বরূপ। ইতিহাসের মাঝেই একটি জাতির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি তথা সমগ্র সভ্যতার প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত। আর দেশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এলাকার ইতিবৃত্তের সমন্বয়েই দেশের সামগ্রিক ইতিহাস রচিত। তাই আঞ্চলিক ইতহাসের গুরুত্বকে কোন ক্রমেই খাটো করে দেখা যায়না। স্বদেশকে জানতে হলে স্বাগ্রাকে জানতেই হবে। কারণ গ্রামেই আমাদের র্মল পরিচয় নিহিত।

     মাদার্শার ইতিহাসের সহিত বাংলাদেশ, ভারত বর্ষ-তথা মধ্য প্রাচ্যের ইতিহাস ঘনিষ্ট ভাবে সম্পৃক্ত। শুধু মাদার্শাই নয় হাটহাজারী, দোহাজারী, ফতেহাবাদ, মীর্জাপুর প্রভৃতি এলাকার নামের উৎপত্তি সম্পর্ক অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে যে, প্রতি টি এলাকার সহিত এক একটি ঐতিহাসিক ঘটনা জড়িত।

     মাদার্শা নামের ইতিকথার সহিত সুফিবাদের কাহিনী ও বিশেষভাবে জড়িত। কারণ এক আধাত্মাবাদী সুফিসাধকের পূন্যস্মৃতিকে এ গ্রাম শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বহন করে আসছে। তাই এ মুহুর্তে সুফিবাদের  ইতিহাস অতি সংক্ষেপে আলোচনা করা প্রাথমিক বলে মনে হয়।

     সমগ্র বিশ্বে সুফিবাদের বিভিন্ন তরিকা বা মতবাদ রয়েছে। যথা কাদেরিয়া, নক্সবন্দীয়া, মোজাদ্দেদিয়া, চিশতিয়া ইত্যাদি। অপর একটি তরিকার নাম মাদারী তরিকা। হযরত বদিউদ্দিন শাহ মাদার উক্ত মাদারী তরিকার প্রতিষ্ঠাতা। তিনি সংক্ষেপে শাহ মাদারী নামেও অভিহিত। এই মহাপুরুষের নামানুসারেই আমাদের প্রিয় মাতৃভুমি মাদার্শার নামকরণ করা হয়েছে।ৱ

     হযরত বদিউদ্দিন শাহ মাদার ১৩১৫ খৃষ্ঠাব্দে সিরিয়ায় জন্ম গ্রহণ করেন। তৎকালে দিল্লীর সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন সুলতান আলা উদ্দিন খিলজী, তখন বাংলায় রাজত্ব করতেন মামলুক বংশীয় সুলতান শামসুদ্দীন ফিরোজ শাহ।

     শাহ মাদার শৈশব থেকেই যৌবন পর্যন্ত কোরান, হাদিস, ফেকাহ শাস্ত্রে গভীর ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। তৎপর কামেল পীরের শিষ্যত্ব অর্জন করেন এবং আধ্যাত্মিক জ্ঞানে সমৃদ্ধ হন। মুর্শিদের নির্দেশক্রমে তিনি ইসলাম প্রচারের জন্য সুলতান ফিরোজ শাহ্ দিল্লীর সিংহাসনে এবং ইলিয়াছ শাহী বংশীয় সুরতান সিকান্দর শাহ বাংলার সিংহাসনে অধিষ্টিত ছিলেন। হযরত শাহ মাদার তাঁর প্রিয় শিষ্য শাহ আল্লাকে নিয়ে ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে ধর্ম প্রচার করেন, অবশেষে তিনি বংগদেশে আগমন করে বিভিন্ন জেলায় ধর্ম প্রচারে মনোনিবেশ করেন, তাঁর পূত চরিত্র এবং অপ্রাম্প্রদায়িক মনোভাব এবং জনসেবামূলক কাজে মুগ্ধ হয়ে হাজার হাজার বংগবাসী তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহন করেন। ফরিদপুরের মাদারীপুর তাঁরই স্মৃতি নিয়ে এখনো বিরাজ করছে।

     অতঃপর শাহ মাদার শিষ্যসমেত চট্টগ্রাম আগমন করেন এবং জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত সফর করেন। চট্টগ্রাম শহরের মাদার বাড়ী এলাকা তাঁরই স্মৃতি বহন করছে। এক পর্যায়ে তিনি তাঁর প্রিয় শিষ্যসহ হিন্দু-বৌদ্ধ অধিবাসী অধ্যুষিত মাদার্শা এলাকা সফর করেন। অচিরে এতদঞ্চলে তাঁর অতুলনীয় চারিত্রিক প্রভাবে ইসলাম ধর্মের প্রসার ঘঠে। তাঁর গুনমুগ্ধ ভক্তগণ পীরের নামানুসারে মাদার্শা গ্রাম ও মাদারী খালের নামকরন করেন।

     অতঃপর শাহ মাদার তাঁর শিষ্য শাহ আল্লাকে বংগদেশে ধর্মপ্রচারের জন্য খলিফা নিযুক্ত করে ভারতে ফিরে যান। ১৪৩৬ খিৃষ্টাব্দে ১২৫ বৎসর বয়সে হযরত বদিউদ্দিন শাহ মাদার ভারতের বানপুরে ইহলোক ত্যাগ করেন, কানপুরেই তাকেঁ সমাধিস্ত করা হয়। সেই সময়ে সৈয়দ বংশীয় সুলতান মুহম্মদ শাহ দিল্লীতে রাজত্ব করতেন এবং হুমাইনী বংশের সুলতান গিয়াসুদ্দীন মাহমুদ বাংলার সিংহাসনে আসীন ছিলেন।

     সুদুর সিরিয়ার মরু অঞ্চল থেকে চট্টগ্রামের শ্যামল পল্লী মাদার্শা পর্যন্ত যিনি ধর্ম ও মানবতার মহিমা প্রচারের কার্যে সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছিলেন মাদার্শার পাখীর কুজনে, মাদারী খাল ও হালদার কলকলোলে তারই যশোগান ধ্বনিত ও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

     মাদার্শার প্রতিটি বাসিন্দা যেদিন সেই মহা মানবের কল্যাণ-কর্ম ও জনসেবার আদর্শে উদ্ধদ্ধ হয়ে উঠবে সেদিনই তাঁর স্মৃতির প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করা হবে।